Uncategorized

দেবীদ্বারে একদেহে দুই মাথা বিশিষ্ট শিশুর জন্ম এলাকায় তোলপাড়

দেবীদ্বারে এক দেহে দুই মাথা বিশিষ্ট ছেলে শিশুর জন্ম নিয়ে এলাকায় নানা মুখরোচক আলোচনায় তোলপাড়। কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবারের অবহেলা অনাদর আর অসহযোগীতায় শিশুটি বেঁচে থাকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অপরদিকে অস্বাভাবিক শিশু জন্ম দেয়ায় প্রসূতীও তার সংসার টিকিয়ে রাখা দায় হয়ে পড়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত শুক্রবার (১৩সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত সাড়ে ১০টায় কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা সদরের সেবা হাসপাতাল (প্রাঃ লিঃ) এ। ওই হাসপাতালে ডাঃ মীর্জা আসাদুজ্জামান রতন’র তত্ববধানে এক দেহে দু’মাথা বিশিষ্ট এক ছেলে শিশুর জন্ম হয়। ওই সংবাদে এলাকায় নানামূখী মুখরোচক আলোচনা ও তোলপাড় চলছে। শিশুটিকে এক নজর দেখার জন্য ভীড় সামলাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিব্রতকর অবস্থায় আছেন বলে জানা যায়।
হতভাগ্য এ শিশুটি কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা বাজার থানা এলাকার কবিতীর্থ নজরুল-নারগিস খ্যাত দৌলতপুর গ্রামের (সীমানাপাড় মধ্যপাড়া) হাজী বাড়ির ওমান প্রবাসী সাদ্দাম হোসেন’র স্ত্রী মরিয়ম বেগম(২০)’র গর্ভে জন্ম নেয়। এ শিশুটি প্রবাসী সাদ্দাম হোসেন’র প্রথম সন্তান। শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার সামর্থ ওই পরিবারের নেই বলে জানা যায়।
শিশুটি জন্মের পর কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন এবং রাতেই শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহিঃবিভাগে নেয়ার পর তাকে ভর্তির স্লিপ দিলেও ভর্তী না করিয়ে শিশুটির পরিবারের লোকজন দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে সারা রাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সী বারান্দায় বসে থেকে শনিবার ভোরে আবারো দেবীদ্বারে ফিরে আসে।
শিশুটির দাদী করুনা বেগম জানান, ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার পর, ওখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ও কর্মচারীরা বলেন, এ রোগের চিকিৎসা ঢাকা মেডিকেলে হয়না, এর চিকিৎসা বিদেশ ছাড়া হবেনা, তাছাড়া আপনারা বার্ডেম হাসপাতালে কিংবা কোন প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেখতে পারেন বলে আমাদের বিদায় করে দেন। সারা রাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সীর বারান্দায় বসে থেকে (শনিবার) ভোরে দেবীদ্বার সেবা হাসপাতালে ফিরে আসি।
সেবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, শিশুটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানোর স্লিপ দিলেও রোগীর পরিবার না বুঝেই দালালের খপ্পরে পড়ে আবার ফিরে আসেন।
এব্যপারে কর্তব্যরত চিকিৎসক ডাঃ মীর্জা আসাদুজ্জামান রতন বলেন, এজাতীয় ঘটনায় এক কোটি প্রসূতীর গর্ভপাতে ২/৩টি দেখা যায়। এক দেহে দুই মাথা নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুর ঘটনায় সারা বিশ্বে মাত্র ১০টি ঘটনার কেইস সংগ্রহ করার তথ্য পাওয়া গেছে। কারন এজাতীয় এক দেহে দুইমাথা বিশিষ্ট কিংবা জোড়া শিশু গর্ভপাতে জন্মনেয়া শিশুগুলো মৃতঃ ভূমিষ্ঠ হয় অথবা জন্মের পর পরই মারা যায়। এজাতীয় রোগীককে ‘ক্রোনিওগ্রেগাস (প্যারাসাইটিক্যাস)’ বলা হয়। একারনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারী বিভাগে কথা বলে আইসিওতে একটি কক্ষের বরাদ্ধ করেই শিশুটিকে পাঠিয়েছিলাম। রাত বেশী হওয়ায় এবং সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ ছাড়াই ভর্তী না করেই শিশুটিকে নিয়ে ফিরে আসেন। শিশুটি ভালো আছে। সার্জারির মাধ্যমে তার একটি মাথা কেটে ফেলে বাঁচানো যেতে পারে। তবে এজাতীয় শিশুর সার্জারীর সময় রক্তশূণ্যতার ঝুকি বেশী থাকে। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে দুই শিশুর অস্তিত্ব দেখা গেলেও জন্মের পরই এক দেহে দুই মাথার শিশুর অস্তিত্ব দেখা যায়।
সেবা হাসপাতালের চেয়ারম্যান আবু ইউছুফ জানান, শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর প্রয়োজন তাই শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় শিশুটির পরিবারকে নানাভাবে বুঝিয়ে এবং ডাঃ মীর্জা আসাদুজ্জামান রতন’র সহযোগীতায় কিছু আর্থিক সহায়তাদানে শিশুটিকে তার মায়ের সাথে পুনঃরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাই। তাছাড়া অস্বভাবিক শিশু জন্মের কারনে পরিবারের অনিহাও দেখতে পাই, এব্যাপারে শিশুটির পিতৃ পরিবারের পক্ষ থেকে কোন ধরনের সহযোগীতা ছিলনা। ওরা এক দেহে দু’মাথা বিশিষ্ট সন্তান জন্ম দেয়ায় প্রসূতীর উপর ক্ষুব্ধতা প্রকাশ করে নানা কুসংস্কারচ্ছন্ন কথা বার্তা বলেছে বলেও শোনেছি। আমরা আর্থিক সহায়তার কথা বলে কিছু সহযোগীতা করেছি। প্রয়োজনে হাসপাতালে থাকা খাওয়া এবং ঔষধে যা খরচ হয় তা নিজ দায়িতে সমাধান করলেও পরবর্তীতে তা আমদের পক্ষথেকে মিটিয়ে দেয়ার আশ্বাসও দেই।
শিশুটির চাচী সালমা বেগম জানান, সাদ্দাম হোসেন প্রায় ৪/৫ বছর যাবত ওমান থাকেন। গত বছর দেশে আসেন এবং ওই বছরের ২০ ডিসেম্বর মুরাদনগর উপজেলার শ্রীকাইল ইউনিয়নের সায়েদাগুপ গ্রামের জলিল মিয়ার ছোট মেয়ে মরিয়ম বেগম’র সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের কিছুদিন পর অর্থাৎ প্রায় ৬ মাস পূর্বে সাদ্দাম আবারও ওমান চলে যায়। তাবে তাদের বাড়ির ভিটে ছাড়া আর কোন জায়গা জমি নেই। আর্থিক দাইন্যতার মধ্যে এরকম একটি শিশু পরিবারটির জন্য একটি বোঝা ছাড়া আর কিছুই নয়। তার চিকিৎসার ব্যয় বহনে সমাজের বিত্তবান কিংবা সরকারের সহযোগীতা বা হস্তক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়।
শিশুটির মা মরিয়ম এবং নানী আনোয়ারা বেগম শিশুর পিতৃপরিবারের ভয় এবং আতঙ্কে এবিষয়ে মুখ খোলতে রাজি হননি। তবে শিশুর নানী আনোয়ারা বেগম জানান, একটি শিশু কান্না করলে অপরটি শান্ত থাকে, কখনো দুটো শিশুই কান্না করে। তবে সোঝা মাথা থেকে বাঁকা মাথার শিশুটি কান্না এবং ছটফট বেশী করতে দেখা যায়।
শিশুটির জন্মের সংবাদ পেলেও তাকে দেখতে দাদী, এক ফুফু ও এক চাচী ছাড়া আর কেহ আসেননি। জানা যায়, অস্বভাবিক শিশু প্রসব করার কারনে প্রসূতীকে আর তার শশুর বাড়িতে না নেয়ার সংকল্পও ওরা জানিয়ে দিয়েছেন। এ রিপোর্ট লিখা পর্যন্ত শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা মেডিকিল কলেজ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে পথিমধ্যে রয়েছেন।